রক মনু

‘শিক্ষা’য় ভক্তি কৃষকের নিজের জন্য ক্ষতিকর

মনসান্টো বা মাহিকো’র কোন কর্মী কৃষকের কাছে গিয়ে বিটি বেগুনের বীজ কেন দরকার সেটি বুঝাচ্ছে—এই রকম একটা ঘটনা নিয়ে ভাবি আমরা। বলে নেয়া দরকার—মনসান্টো একটি বহুজাতিক কর্পোরেট এবং মাহিকো ভারতের বীজ কোম্পানি; এই দুই পক্ষ মিলে কৃষি-গবেষণা চালায় একসাথে, এই গবেষণার একটা ধরন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং; বিভিন্ন প্রাণীর জিন অদল-বদল করে হাইব্রিড প্রাণী তৈরি করে; প্রাণী মানে প্রধানতঃ বিভিন্ন শষ্য—ঢাকায়/বাংলাদেশে এখন আমরা যেই চাল, লাউ, টমেটো বা পেপে খাই তার বেশিরভাগ কোন না কোন গবেষণার ফল। গবেষণা পদ্ধতিগুলির মধ্যে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সবচেয়ে কার্যকর, কেননা এতে অল্প সময়ে নতুন প্রাণী তৈরি করা যায়; প্রাকৃতিক পরাগায়নের মাধ্যমে নতুন জাত করার গবেষণায় অনেকবার পাশাপাশি দুইটা জাতের শষ্য চাষ করলে নতুন জাত তৈরি হতে পারে, নাও পারে; এতে বহু বছর লেগে যায়; গবেষক কোম্পানির জন্য এটি লাভজনক হতে পারে না প্রায়ই।

আমরা বুঝবার চেষ্টা করছিলাম—মনসান্টো বা মাহিকোর প্রতিনিধির সাথে কৃষকের যোগাযোগের ঘটনাটা কেমন হবে। প্রথম সম্ভাবনা হলো, এই ঘটনাকে কৃষক ভাববে—একজন ‘শিক্ষিত’ মানুষ তাঁকে কৃষির ভালো-মন্দ বুঝিয়ে দিচ্ছে; এতে কৃষক সম্মানিত বোধ করতে পারে। আমাদের দেশে অশিক্ষিতের সাথে শিক্ষিতের আলাপ কম; রিক্সাওয়ালার সাথে যাত্রীর আলাপের সম্ভাবনা থেকে এটা বোঝা যেতে পারে; যাত্রী নারী হলে আলাপের সম্ভাবনা আরো কমে সম্ভবত। এদিকে বেশিরভাগ কৃষক আমার বিবেচনায় নিজেকে যথেষ্ট ‘শিক্ষিত’ ভাবে না। কিন্তু ‘শিক্ষিত’ হওয়া আমাদের সমাজে ‘মানুষ হওয়া’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। এই ভাবনা প্রতিদিন অশিক্ষিতদের বলতে থাকে সরকার, টিভি, রেডিও, এনজিও ইত্যাদি। দেশের বেশিরভাগ কৃষককে মুসলমান ধরলে ইমলামও তাদের প্রতিদিন শিক্ষার মর্যাদা জানিয়ে যায়। শিক্ষার মর্যাদা কৃষকের কাছে একদম পরিষ্কার হয়ে যায় সমাজের সকল ক্ষমতা মোটামুটি ‘শিক্ষিত’দের হাতে থাকায়। এই ‘শিক্ষিত’ মানুষ কোন কৃষককে আলাপ যোগ্য মনে করাটা কৃষককে ধন্য হবার মতো অনুভূতি দিতে সক্ষম।

-------------------------

মাহিকোর প্রতিনিধিকে কৃষক ‘শিক্ষিত’ হিসেবে বুঝতে থাকায় অনেকগুলি বিপদ ঘটে যায়। শিক্ষিতের এই সম্মান ঐ প্রতিনিধির কাছে একটি ‘বিজনেস টুল’; কৃষক ফেরিওয়ালাকে যেভাবে যাচাই করা দরকার বলে মনে করে, যে জিনিসটা কিনবে সেটি যেভাবে পরীক্ষা করে দেখা দরকার মনে করে, সেই মনে করা থেকে ঐ প্রতিনিধি প্রথমেই ছাড় পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফেরিওয়ালার তুলনায় ‘শিক্ষিত’ প্রতিনিধি যেনবা ‘স্বাভাবিক মিত্র’! কৃষকের কাছে মাহিকোর পণ্য বিক্রির সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ঐ প্রতিনিধিকে বিক্রেতা আর নিজেকে ক্রেতা হিসেবে চিনতে না পারায় কৃষকের স্বার্থহানি ঘটে।

কিন্তু, এইটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরো গুরুতর বৈশিষ্ট্য আছে এই ঘটনার। এজন্য আমাদের কৃষিশিক্ষা বোঝা দরকার হবে। যেই ‘শিক্ষিত’ প্রতিনিধি কৃষকের কাছে মাহিকোর বীজের গুরুত্ব বোঝাতে যাবে বা বিভিন্ন মিডিয়ায় কৃষি বিষয়ে অনুষ্ঠানের কৃষি-শিক্ষকদের কৃষিশিক্ষা বোঝা দরকার আমাদের। ধরা যাক, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এর লক্ষ্য কী? এক কথায় ছোট জীবনচক্রের এমন এমন জাতের কৃষি উদ্ভিদ তৈরি করা যেগুলি একই সাথে উচ্চফলনশীল, এবং উদ্ভিদ আক্রমণকারী পোকা, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ইত্যাদি প্রতিরোধে সক্ষম। এজন্য মাটি, সার, কীটনাশক, শষ্যের জিন এবং জাত ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করা হয় ওখানে। এই শিক্ষায় এখনকার ক্রেজ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নামের বায়ো-টেকনোলজি। এতে উৎপাদিত নতুন একটা জাত জীবজগতের আর কারো জন্য ক্ষতিকর কিনা সেটা গবেষণায় একটা কৃষি ইন্সটিটিউটের গুরুত্ব কম, সেটি পরিবেশ শিক্ষার কাজ মূলতঃ। ক্ষতিকর কিছু হলে কী হবে? সেটা দেখবে বায়ো-কেমিস্ট্রি বা ফার্মাসি এবং মেডিক্যাল সায়েন্স। শিক্ষার বিভিন্ন বিভাগ এভাবে আলাদা আলাদা হয়ে আছে; আবার প্রতিটি বিভাগেরই আছে শ্রেষ্ঠতার দাবি। খাদ্য ঘাটতির ধারনা, মানুষ বাড়ে জ্যামিতিক হারে যেখানে উৎপাদন গাণিতিক হারে—এমন তত্ত্ব, জনসংখ্যা একটি বোঝা বলে সার্বক্ষণিক প্রচার। ফলে পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাবনা বোঝার দরকার নাই যেন কৃষিবিজ্ঞানের; বরং ফার্মাসি আর বায়ো-কেমিস্ট্রি তো আছেই তার তার দায়িত্বে!

ইউরোপ আমেরিকা থেকে আসা জ্ঞানকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কিভাবে দেখে সেটিও বোঝা দরকার। বিদেশের শিক্ষা-ব্যবস্থা আমাদের থেকে উন্নত—এমন ধারনা তো আছে; কিন্তু এই ধারনাকে ঠিক ধরলেও খুঁজলেই বোঝা যাবে বিদেশি শিক্ষার নামে যা আসে তা আসলে মাহিকো বা মনসান্টো ধরনের কোম্পানির গবেষণা প্রকল্প। এই কোম্পানিগুলি বাংলাদেশের মতো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সরাসরি টাকা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে বা বিভিন্ন দাতা প্রতিষ্ঠানে টাকা দিয়ে গোপনে নিজেদের বাণিজ্যিক প্রয়োজনের গবেষণা করায়। যেসব গবেষণা ইউরোপ-আমেরিকার নাগরিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলি এসব বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন এনজিও’র মাধ্যমে করায়। একই সাথে বিভিন্ন ধরনের একাডেমিক সভা-সেমিনারের মাধ্যমে ব্যবসাবান্ধব বিভিন্ন খণ্ডিত/আংশিক জ্ঞান প্রচারের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে থাকে। নীতি-নির্ধারক রাজনীতিবিদদের কিনে এই শিক্ষার প্রসার আরো বাধাহীন করে তোলে। ফলে এটি আদৌ বিদেশি শিক্ষাই নয়; এমনকি ওইসব দেশের শিক্ষাও কর্পোরেট প্রয়োজনের বাইরে নয়!

আমাদের দেশে এসব শেখা মানুষকেই ‘শিক্ষিত’ বলা হয়; এরাই সমাজে শ্রদ্ধেয়; শ্রদ্ধেয় হিসেবে এবং সমাজের ক্ষমতাবান অংশের সদস্য হিসেবে এরা কৃষিক্ষেত্র দখল করে নিতে পারে সহজেই। এই দখলে ‘শিক্ষিত’দের সরাসরি ‘আধুনিক ফার্মার’ হয়ে ওঠারো বিরাট ভূমিকা আছে। কিন্তু আধুনিক কৃষি গবেষণায় এমন কোন কৃষি প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি যেটি সামগ্রিকভাবে পরিবেশ, জীবজগৎ, ভূমি, কৃষকের স্বাস্থ্য, ভোক্তার শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। হাইব্রিড বিভিন্ন খাবারের সাথে বহু জটিল রোগের সরাসরি সম্পর্ক প্রতিদিনই জানা যাচ্ছে।

ফলে কেবল দেশের কৃষিক্ষেত্র বিপদে আছে বলা যাবে না; আমরা সকলে বিপদে আছি। নতুন নতুন বিভিন্ন দুঃখও তৈরি হচ্ছে সমাজে; যেমন, ঢাকায় আমি পাকা পেঁপে পাইনি আমি যা ২০ বছর আগে আমার বাড়িতে তৈরি হওয়া পেঁপের স্বাদের সাথে মেলে; আমার চোখ বেধে খাওয়ালে আমি বুঝতেই পারবো না পেঁপে খাচ্ছি; বহু দিন পেঁপে খাই না আমি। লাউ সিদ্ধ হয় না, টমেটো থেকে আঁশটে গন্ধ পাওয়া যায়! এই শিক্ষিতকে সম্মান করার আরেক নাম কৃষকের আত্মহত্যা।

দেশের অল্প কিছু মানুষ এগুলি প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। পারছে না তাঁরা—সংখ্যা ও ক্ষমতা অল্প বলে। এমন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার যদি এভাবে পরিবেশ, জনগণ—দেশের স্বার্থ বিরোধী কাজ করতে থাকে, কৃষি উন্নয়নের নামে কৃষক ও কৃষিকে ধ্বংস করে ফেলতে থাকে তাহলে তা ঠেকাবার জন্য বহু রাস্তায় যাবে মানুষ। বহু উপায়ে মিত্র খুঁজে নেবে। এই যে জিনের অদল-বদল করে নতুন নতুন প্রাণী তৈরি করা হচ্ছে তাকে সৃষ্টিতে মানুষের শরীকী দাবি করা হিসেবেও বুঝতে ও বোঝাতে চাইবেন অনেকে। ‘শিক্ষিত’ সমাজ সৃষ্টিতে অংশীদার বলে দাবি করছে নিজেকে—এমন ভাবনা সমাজে ছড়িয়ে পড়লে অশিক্ষিতের শ্রদ্ধা রক্ষা করতে পারবে না শিক্ষিতদের। শিক্ষা দিয়ে অশিক্ষিতকে শাসন করা যাচ্ছে এখন শিক্ষায় অশিক্ষিতের শ্রদ্ধার কারণে; স্বার্থবিরোধী হবার পরেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়তো বুঝতে পারছে না অশিক্ষিতরা; সৃষ্টি নিয়ে তামাশা হিসেবে ভাবার মাধ্যমে ঐ শ্রদ্ধা যদি উড়ে যায় তাহলে কী হবে ভাবছেন কেউ?

৩১ অক্টোবর ২০১৩


Warning: Unknown: write failed: No space left on device (28) in Unknown on line 0

Warning: Unknown: Failed to write session data (files). Please verify that the current setting of session.save_path is correct (/var/cpanel/php/sessions/ea-php70) in Unknown on line 0