রক মনু

ভালোর শাসন বনাম গণতন্ত্র, কোনটা নেবেন?

আগামী সরকার গঠনে নির্বাচনের কোন ভূমিকা থাকছে না, কিন্তু সেই সরকারকে গণতান্ত্রিক হিসেবে মানতে বলছে ১৪ দল। মেনে নেবার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে; এজন্য গণতন্ত্রের সাথে নির্বাচনের সম্পর্ক নাই বা খুবই কম বলে ভাবতে হবে আমাদের; এ রকম একটা ঘোষণা ১৪ দলের পক্ষ থেকে পাওয়া গেলে আমাদের সুবিধা হতো আরো। তা অবশ্য পাইনি আমরা।

নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য অদরকারি জিনিস—এমন কোন ঘোষণা ১৪ দল এখনি না দিলেও জনগণ তেমন করে ভাবা শুরু করলে নিশ্চই ভালো লাগবে তাদের। কিন্তু এটাকে কেবল ১৪ দলের ভাবনা হিসাবে দেখতে পাই না আমি। প্রায় পুরো সুশীল সমাজ যে বাংলাদেশের নির্বাচন অপছন্দ করে সেটি বিভিন্নভাবেই প্রমাণ করা যায়। প্রতিটা নির্বাচনের পরে পরে ‘খারাপ’ মানুষদের নির্বাচিত হওয়ায় সুশীল সমাজের আক্ষেপ দেখতে পাই আমরা। জনগণের ভোটের চাইতে ‘ভালো’র গুরুত্ব বেশি দেয় সুশীল সমাজ। আমরা এটি সহজে বুঝবো যদি লালসালুর কথা ভাবি; সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ বাংলাদেশের অশিক্ষিত মানুষকে লালসালুতে মোহগ্রস্ত হিসাবে দেখেছেন, পরে এই উপন্যাসকে পরবর্তীতে স্কুল-কলেজে পাঠ্য করেছে বাংলাদেশের সুশীল সমাজ। বাংলাদেশের মানুষকে হুমায়ুন আজাদ মধ্যযুগীয়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, প্রথাবদ্ধ হিসাবে ঘৃণা করে গেছেন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বাংলাদেশের সমাজ এবং মানুষকে অন্ধকারাচ্ছন্ন বলে যাচ্ছেন আলোকিত মানুষ চেয়ে চেয়ে। বদিউল আলম মজুমদার এবং তাঁর সহসংগঠকগণ নিজেদের সংগঠনের নাম ‘সুজন’ রাখার মধ্য দিয়ে জনগণের ভোট এবং রাজনীতির প্রতি তাদের ভাবনা জানিয়ে যাচ্ছেন। বা আমরা মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ মানুষ তৈরির চেষ্টার কথা ভাবতে পারি। ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ মানুষ তৈরির এজেন্ডা নিয়ে আন্দোলন করতে হলে শুরুতে হুমায়ুন আজাদের মতোই বাংলাদেশের মানুষকে ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভেবে নিতে হয়।

-------------------------

যে নামগুলো নেওয়া হলো তাঁরা আমাদের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সমাজের সবচে শ্রদ্ধেয় মানুষজন। দেশের জনগণ সম্পর্কে এ ধরনের ভাবনা লালন করার পরে জনগণের নির্বাচনী প্রজ্ঞার উপর আস্থা রাখা যায় না আর। ‘খারাপ’ মানুষেরা নির্বাচিত হবার পরে সুশীল সমাজের আক্ষেপের মাঝে জনগণের প্রতি ঐ অনাস্থাই প্রকাশিত হয়। ফলে তাঁরা নির্বাচন অপছন্দ করেন, কারণ তাঁরা ‘ভালো’র শাসন চান। খেয়াল করলে আমরা দেখতে পাবো, আমাদের সুশীল সমাজের প্রধান ব্যক্তিরা জীবনে কোন ধরনের নির্বাচনেই প্রার্থী হন নাই সম্ভবত, বা বড়জোর বন্ধুদের নিয়ে তৈরি করা সংগঠনের বিভিন্ন পদে প্রস্তাবিত এবং সমর্থিত হয়েছেন মাত্র।

এবারে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার তৈরিতে ঝুঁকি আরো বেশি। কারণ, এমন দল বা জোটকে নির্বাচন করতে পারে জনগণ যেই দল বা জোট যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেবে। আমাদের সুশীল সমাজের প্রায় পুরোটা যুদ্ধাপরাধের বিচার চাচ্ছে এখন, ফলে ১৪ দলকে ক্ষমতা থেকে সরাবার ঝুঁকি নিতে পারছে না তাঁরা। জনগণ যেহেতু সবসময়ই ভুল মানুষকে নির্বাচন করে তাই নির্বাচনকে অদরকারি করে দেয়া গেলে খারাপ মানুষেরা নির্বাচিত হতে পারবে না, তার উপর যুদ্ধাপরাধের বিচারও নিশ্চিত হবে।

দেখা যাচ্ছে, আগামী সরকার গঠনে নির্বাচনের কোন ভূমিকা না থাকে সে ব্যাপারে আমাদের সুশীল সমাজ এবং ১৪ দলের অভিন্ন স্বার্থ আছে। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে সরকার গঠনে নির্বাচন অপ্রয়োজনীয় করে তোলার শক্তি ও সাহস ১৪ দল ঐ অভিন্ন স্বার্থের জায়গা থেকে পাচ্ছে। মহাজোট সরকারের টিকে থাকা এবং নির্বাচন এড়াবার সাহসের পেছনে যাঁরা ভারতের সাথে সরকারের বিশেষ সম্পর্ককে প্রধান হিসাবে দেখতে পান তাদেরকে ঐ সুশীল সমাজেরই আরেকটি অংশ বলতে হচ্ছে। কেননা নিজেদের শিক্ষিত এবং সুশীল সমাজ ভাবছে এমন বিরাট সংখ্যক নাগরিকের এই সমর্থন দেখছে না তাঁরা, অন্যদিকে অপছন্দের সরকার উৎখাত করার সামর্থ রাখে জনগণ সেটিও ভাবতে পারছে না। বরং উল্টো বিষয়টি। সরকারের সাথে সুশীল সমাজ আছে বলেই ভারতও আছে। ভিন্ন একটা জায়গা থেকে ভাবতে বলবো বিষয়টা। বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিক কাজ করছে। কয়েকদিন আগে সরকারি উচ্চ পদেও একজন ভারতীয় নিয়োগ পেয়েছেন।

দেশের সুশীল সমাজের কর্মক্ষেত্রগুলিতেই এই ভারতীয় নাগরিকরা কাজ করছে; এই ভারতীয় নাগরিকদের বিভিন্ন অত্যাচারের কথাও শোনা যায় পরিচিত কর্পোরেট চাকুরেদের কাছে; কিন্তু সমাজে এই ভারতীয় নাগরিকদের আদৌ কোন সমস্যায় পড়ার কথা শোনা যায় না। ভারতীয় আধিপত্য নিশ্চিতভাবেই আছে বাংলাদেশে। কিন্তু আরো বড়ো ভাবনার বিষয় হলো সমাজে এই আধিপত্যের গ্রহণযোগ্যতা। নির্বাচন অপছন্দ করা সুশীল সমাজের বিচারের আকাঙ্খা পূরণের জন্য মহাজোট সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ ভারতের আধিপত্যকে আরো বিস্তৃত এবং গ্রহণযোগ্য করে তুলছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারবিরোধী দলগুলি, বিশেষ করে বিএনপির স্ট্রাটেজি কি হবে? এই আধিপত্য বিএনপি অপছন্দ করলে অন্তত তার সমর্থক জনগণের অংশটিকে বিএনপি কিভাবে রক্ষা করবে? বিএনপি আন্দোলন করছে; আন্দোলন তো করবেই। কিন্তু এ ধরনের আন্দোলনে যে ফলগুলি পাবার কথা তা কি পাচ্ছে বিএনপি বা জনগণের ভিতর তার সমর্থক অংশ? নিশ্চিতভাবেই পাচ্ছে না। না পাবার কারণ ভাবা দরকার বিএনপির।

যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে দেশের সুশীল সমাজকে শত্রু করে রাখছে বিএনপি। তাতে করে জামাতের সাথে পলিটিক্যাল মৈত্রী রাখা যাচ্ছে নিশ্চই। কিন্তু বিএনপির ভিতর লাভক্ষতির হিসাবটা পরিষ্কার থাকা দরকার। প্রথমত নির্বাচন এড়াবার পরেও শেখ হাসিনার সরকারের উপর বিশেষ আন্তর্জাতিক চাপ সত্যিকার অর্থে দেখা যাচ্ছে না। ২০০৬/০৭-এর মতো করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের সদস্য সংখ্যা কমায়নি জাতিসংঘ। বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখছে আওয়ামী লীগ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা মধ্যপ্রাচ্য থেকেও কোন সত্যিকার চাপ দেখা যায়নি। যুদ্ধাপরাধের বিচারের মতো বিষয়ের সরাসরি বিরোধিতা করতে পারে না কেউ আসলে; বিএনপিও পারেনি। এমনকি জামাতও বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনা করছে, আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা করেছে, কিন্তু সরাসরি বিচারের এসেন্স বিষয়ে বিরোধিতা করতে পারে নাই। কেবল পাকিস্তান একটা উটকো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সরাসরি, যেটি পাকিস্তানেও বিরোধিতার সামনে পড়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে পশ্চিমা শক্তিগুলি আওয়ামী লীগরেই সবচে বেশি বিশ্বাস করে। বিএনপির সময়কার বোমা হামলা, বাংলা ভাই ইত্যাদি ঘটনার মাধ্যমে বিএনপির বিশ্বস্ততা এখনো প্রশ্নের মুখে আছে সম্ভবত।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিশ্বস্ততা ফিরে পাবার চেষ্টার সাথে দেশের সুশীল সমাজের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য হবার চেষ্টা করা দরকার বিএনপির। এই সব পক্ষকে ছাড়তে রাজি হয়ে কেবল জামাতের মৈত্রী দিয়ে খুব বেশি আগাতে পারবে না বিএনপি। বড়জোর মধ্যবর্তী কোন রাস্তা খোঁজা যেতে পারে। সেজন্য একটা ভালো ইস্যু হতে পারে পাকিস্তান। পাকিস্তান বিষয়ে সরাসরি কিছু বক্তব্য দিলে জামাতেরও প্রাকটিক্যাল সমস্যা নাই; কারণ, বাংলাদেশে রাজনীতি করা বা ব্যবসা—কোন ক্ষেত্রেই জামাত পাকিস্তানের উপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়। যতটুকু সম্পর্ক আছে সেটা বড়ো স্বার্থের কারণে সম্ভবত ছাড়তে রাজি হবে জামাত।

৭১-৭৫ বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কিছু কাজ করে। সেই ব্যাপারে অ্যাকশন নেবার কথা বলতে পারে বিএনপি। একাত্তরে বাংলাদেশ আক্রমণ, খুন, ধর্ষণ, আগুন দেওয়া, বোমা মারা ইত্যাদির কারণে পাকিস্তানের কাছে কয়েকশো কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ পাবার হক ছিলো বাংলাদেশের। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার দাবি তুলতে পারে বিএনপি। পাকিস্তানীদের যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথাও বলতে পারে বিএনপি, প্রতিশ্রুতিও দিতে পারে। এতে যে জামাতের বিশেষ ক্ষতি নাই সেটি জামাতকে বুঝাতে পারতে হবে বিএনপির। এর মধ্য দিয়ে ৭১-৭৫ বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত সমালোচনা তৈরির পাশাপাশি দেশের সুশীল সমাজের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারবে। দেশের সুশীল সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাসও ক্রমে ফেরত পাবে বিএনপি। দুইভাবেই শেখ হাসিনা দুর্বল হতে থাকবে।

পাকিস্তানের সহযোগিতা ছাড়াই বিএনপি পলিটিক্যালি টিকে থাকতে পারবে, কিন্তু দেশের পুরো সুশীল সমাজ এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর বিশ্বস্ততা অর্জন ছাড়া বিএনপির শক্তিশালী হওয়া খুবই কঠিন হবে। নির্বাচন এড়াবার ব্যাপারে শেখ হাসিনা এবং সুশীল সমাজের ঐকমত্য এভাবেই ভাঙতে পারবে বিএনপি। আওয়ামী লীগ এবং ভালোর শাসন চাওয়ার আড়ালে অভিজাততন্ত্রী সুশীল সমাজকে গণতন্ত্রী করে তোলার দায়িত্বও নেওয়া উচিত হবে এখন বিএনপির।

বাংলাদেশের আদালত ৯০% জনগণের সাথে কথা বলে না; মানে ইংরেজিতে কথা বলে; ১৯৫৯ সালের পাকিস্তান সামরিক শাসকরা আদালতে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের ফর্ম হিসাবে চালু থাকা জুরি ব্যবস্থাটাও তুলে দেয়; সেটি আর চালু করেনি বাংলাদেশ। দেশের পুলিশ-আমলারা জনগণকে শ্রদ্ধা তো দূরের কথা, নির্যাতনের চূড়ান্ত আচরণ করে, জনগণের পক্ষে এই রাষ্ট্রে একটা প্রতিষ্ঠান নাই, ব্যবসায়ীদের শোষণ এবং মুনাফা নির্যাতনে পরিণত হলেও জনগণের পক্ষে কাজ করে না রাষ্ট্র, এনজিও, নাগরিক সংগঠন। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের একমাত্র লক্ষণ ছিলো জনগণের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত সরকার। বিরোধী দল হিসাবে গণতন্ত্রের এই শেষ লক্ষণটাও রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যতের বিএনপি আজকের বিএনপিকে ক্ষমা করতে পারবে না।

২ জানু ২০১৪