সামরিক অভ্যুত্থান নাকি প্রেসিডেন্ট হত্যা?

দেশের প্রেসিডেন্ট খুন হইলেই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে যায় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বহু দেশের প্রেসিডেন্ট খুন হয়েছেন, তাতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে যায়নি সব দেশেই। খুনটা এমনকি সামরিক বাহিনী করলেও সামরিক অভ্যুত্থান হয় না।

কারণ, বিষয়টা সামরিক বনাম বেসামরিক। শাসক ব্যক্তিমাত্র। শাসক খুন হলেই শাসনের উত্খাত হয় না। যেমন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট খুন হলেন; বেসামরিক শাসক উত্খাত হলেন বটে, বেসামরিক/সিভিল শাসন বহাল থাকল। সিভিল পলিটিশিয়ান খন্দকার মোশতাক হলেন নতুন প্রেসিডেন্ট। ক্যান্টনমেন্ট শাসন করবে, এমন কোনো চিন্তা এই খুনিদের মাঝে দেখা যায়নি। তখনো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানত, দেশের বৈধ শাসক হলেন সিভিল পলিটিশিয়ানরা। পাকিস্তানে ভুট্টোকে উত্খাত করে জিয়াউল হকের অভ্যুত্থানের সঙ্গে তুলনা করে বলব, বাংলাদেশের ফ্রিডম ফাইটের মাধ্যমেই আমাদের সামরিক বাহিনীর ভেতরে সিভিল পলিটিশিয়ানদের এই শ্রেষ্ঠত্ব তৈরি হয়েছিল। পরে খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান জিয়াকে বন্দি করে সামরিক বাহিনীতে অভ্যুত্থান করেন বটে, কিন্তু তিনিও রাষ্ট্রের শাসন নিজের (ক্যান্টনমেন্টের) হাতে নেয়ার কথা ভাবতে পারেননি।

-------------------------

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে কিছু একটা স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা গেলে সেটি পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আলাদা মনস্তত্ত্ব হবে। পাকিস্তানে আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়াকে পেয়েছি আমরা। সিভিল শাসন দুর্বল এবং ব্যর্থ, সামরিক নেতৃত্বেই দেশের সত্যিকার মঙ্গল এবং শক্তি; পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে এই ভাবনা সেই ১৯৫৮ সাল থেকেই। ১৯৭৮ সালে ভুট্টোরে উত্খাত করা জিয়াউল হক সেই সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার ধারাবাহিকতা মাত্র।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টেও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ওই ধারণা অনুপস্থিত দেখা যাচ্ছে। ওই বছরের ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সিভিল শ্রেষ্ঠত্ব নামের এই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বহাল ছিল। প্রেসিডেন্ট খুন হলেও সেনাবাহিনীর শাসনের নিচে পড়ি নাই আমরা।

ওই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ খুন করলেন আসলে কর্নেল তাহের। ১৫ আগস্টের সেনাবাহিনীর মাঝে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের বোধ দেখতে না পেয়ে খুনি চক্রের মেজর ডালিমকে উপহাস করেন কর্নেল তাহের, “…র মেজর হয়েছ, এখন পর্যন্ত একটা মার্শাল ল প্রক্লেমেশন ড্রাফট করতে পারলে না। (মহিউদ্দিন আহমদ)” প্রেসিডেন্টকে খুন করেও অভ্যুত্থান করবার কথা ভাবতে না পারায় তাহেরের এই তাচ্ছিল্য পাইলেন মেজর ডালিম।

এই তাচ্ছিল্যের পয়দা আসলে পাকিস্তান ক্যান্টনমেন্টে। এরা দুজনই ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। মুক্তিযুদ্ধের ফলাফল হিসেবে মেজর ডালিম ভুলে গিয়েছিলেন ‘মার্শাল ল প্রক্লেমেশন ড্রাফট’ করার শিক্ষা এবং হারিয়ে ফেলছিলেন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মনোভাব। তাহেরের স্মৃতি প্রখর, তার মনে ছিল দুটিই। ভেতরে আইয়ুবের সামরিক দম্ভ নিয়ে জাসদ করছিলেন তাহের।

আইয়ুবের সামরিক দম্ভ আবার দেখান তাহের এলিফ্যান্ট রোডে তার ভাইয়ের বাসায় জাসদের মিটিংয়ে, ৭ নভেম্বরের আগে আগে। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ রাতে বিপ্লব করতে নামায় তাহেরের প্রস্তাবে রাজি হয়নি জাসদের বেসামরিক নেতৃত্ব। পার্টির অধস্তন নেতা কর্নেল তাহের সিভিল নেতৃত্বের প্রতি সামরিক তাচ্ছিল্য দেখিয়ে বিপ্লব করতে নামেন। জাসদে সামরিক অভ্যুত্থান করেন তিনি। বাংলাদেশে সিভিল পলিটিশিয়ানবিরোধী সামরিক অভ্যুত্থান এটিই প্রথম। বিপ্লবের ইস্যুতে তাহেরকে শ্রদ্ধা করেন বাংলাদেশের অনেক বিপ্লবী রাজনীতিক এবং লেখক। তাকে নায়ক করে উপন্যাস লেখা হয়েছে বাংলায়, সেটি পুরস্কারও পেয়েছে। উপন্যাসের লেখক সিভিলিয়ান হলেও তার বিশ্বাস সামরিক শ্রেষ্ঠত্বেই। বইয়ের নামটাও সামরিক ‘ক্রাচের কর্নেল’। সিভিল পলিটিশিয়ানদের জাজমেন্টের প্রতি তাহেরের ওই আইয়ুবি তাচ্ছিল্য হিসেবে নিলে বুঝবেন, তাহের যতটা বিপ্লবী, তার চাইতে বেশি সামরিক। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয়ার পরও ‘কর্নেল’ পদবি ছাড়েননি তিনি। আইয়ুবের সময়কার ‘লৌহমানব’ ধারণা বাংলাদেশে উদযাপিত হচ্ছে এখন তাহেরকে (কর্নেল) সেলিব্রেট করার মধ্য দিয়ে।

সিকিউরিটি গার্ডের শাসনে বাংলাদেশকে দেখার স্বপ্ন পূরণ করে মরতে পারেননি তাহের। কর্নেলের স্বপ্ন পূরণ করেন আরেকজন মেজর, তিনি জিয়াউর রহমান। ‘বিপ্লবী’ তাহেরের সঙ্গে জিয়া বেঈমানি করেছেন বলে অভিযোগ করেন তাহেরপ্রেমিকরা। অথচ জাসদ/গণবাহিনী/তাহেরের বিপ্লবে কখনো শরিক ছিলেন না জিয়া, ছিল না বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক। সেনাবাহিনীর উপপ্রধান বা প্রধান থাকাকালে ক্যান্টনমেন্টে জিয়াকে লুকিয়েই কাজ করত জাসদ-তাহের।

৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের হাতে বন্দি জিয়াকে কর্নেল তাহের মুক্ত করেছেন এবং জিয়া তাহেরকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে যুক্তি দেন কতিপয় তাহেরপ্রেমিক। কিন্তু যেই বিপ্লবের ধারণায় বিশ্বাসই নেই, সেই বিপ্লব সফল করতে কেন প্রতিশ্রুতি দেবেন জিয়াউর রহমান? জিয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়ার অর্থ হলো আসলে মুক্ত হননি জিয়া, স্রেফ বন্দির হাতবদল হয়েছে মাত্র; খালেদের বন্দি এখন তাহেরের বন্দি। আমাদের মনে পড়বে কীভাবে শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড মারার কথা স্বীকার করেছিলেন জজ মিয়া, সেই কথাও। আমাদের আরো খেয়াল করা দরকার, খালেদ আর তাহেরের পার্থক্য। সেনাবাহিনীতে খালেদের অভ্যুত্থানে মরেনি একজনও, আর তাহেরের হাতে মরেছেন অগুনতি। সেনাবাহিনীতে বিপ্লবের শত্রুরা মরেছেন সবাই; ফলে বন্ধুর অভিনয় ছাড়া উপায় ছিল না জিয়ার।

তাহেরের বন্দি জিয়া মুক্ত হইছেন পরে, সিপাহিদের মাঝে নিজের প্রতিষ্ঠা দিয়া। তাহের খুন করে ফেলতে পারে তেমন একটা ক্রিটিক্যাল সময় পার করলেও তার স্বপ্নই বাস্তবায়ন করেছেন জিয়া। তাহেরের ফাঁসির পরে তখনি সামরিক শাসক হননি জিয়া। তাহেরের স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনী শাসন করবে দেশ, জিয়া সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন। তাহেরের ভাবশিষ্য হয়ে জিয়া ভাবলেন, সেনাবাহিনীই শাসনের সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী। ফ্রিডম ফাইটের মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে ভিন্ন হয়ে পড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আবার সেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী হিসেবে তৈরি করার ফিলসফার কর্নেল তাহের।

জেনারেল জিয়া এমনকি কর্নেল তাহেরের অন্য স্বপ্নও পূরণ করেন। সেনাবাহিনী এবং জনগণের সমন্বিত শ্রমে খাল কাটার মাধ্যমে তাহের-জাসদের স্লোগান ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই (সিপাহি-জনতার মাঝে মেয়ে ছিল না নিশ্চয়ই!)’-এর প্রতীকী বাস্তবায়ন ঘটান জিয়া। ১৫ আগস্ট দেশের প্রেসিডেন্ট খুন হওয়া, নাকি জিয়া-এরশাদ-মঈন হওয়ার রাস্তা তৈরি করতে ৭ নভেম্বর ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ খুন হওয়া— কোনটায় বেশি দুঃখ করব আমরা?

২০১৪-০৮-১৬ ইং।। বণিকবার্তা

  • Ashique Reja

    বাংলাদেশে দারোয়ানের শাসনের প্রবর্তন ও কর্নেল তাহেরের রাজনীতি নিয়া এর চেয়ে ভালো কোন মুল্যায়ন এখনও পড়েছি বলে মনে হয় না। ব্রাভো রক!